ভাইরাল খবর
চলে গেলেন কবি ও সাংবাদিক রাহুল পুরকায়স্থ, থেমে গেল এক নিঃশব্দ স্বর
ডিজিটাল ডেস্কঃ
“কাহিনিরা মৃতপ্রায় হরিণের চোখ
দৃষ্টিতে সবুজ পাতা ক্রমে ক্রমে শুষ্ক হয়ে আসে,
পতঙ্গেরা ঘোরে-ফেরে,
ফড়িংয়েরা উড়ে এসে দৃশ্যপথে বসে
তারাও কি মরে যাবে হরিণের সাথে
কাহিনির শেষে!”
এই কবিতার অন্তিম পঙক্তিগুলোর মতোই যেন ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেলেন কবি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী রাহুল পুরকায়স্থ (Rahul Purkayastha)। শুক্রবার দুপুর ২টো ১০ মিনিটে কলকাতার একটি বেসরকারি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বয়স হয়েছিল ৬১ বছর।
গত কয়েকদিন ধরে শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক ছিল। ২২ জুলাই ভোরে তাঁর শরীরের অবস্থার হঠাৎ অবনতি ঘটে। পালসের ওঠানামা, অনিয়মিত হার্টবিট— চিকিৎসকরা তাঁকে external pacemaker বসানোর সিদ্ধান্ত নেন, যা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হলেও ছিল একমাত্র উপায়। এরপর শুরু হয় intubation-এর মাধ্যমে সময় জয়ের চেষ্টা। পরদিন সাময়িক স্থিতি এলেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে দ্রুত। Sepsis ধীরে ধীরে ছয়টি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে অকার্যকর করে দেয়। বেড়ে যেতে থাকে CRP ও Lactate level। শুরু হয় dialysis। শেষ পর্যন্ত সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে চিরবিদায় নিলেন রাহুল।
শব্দ আর শিরোনামের জগতে নিঃশব্দ অথচ দৃঢ় উপস্থিতির নাম ছিল রাহুল। কবিতাই ছিল তাঁর প্রথম প্রেম। আশির দশকে লেখালেখির শুরু। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘অন্ধকার, প্রিয় স্বরলিপি’। এরপর একে একে প্রকাশিত হয় ‘নেশা এক প্রিয় ফল’, ‘আমার সামাজিক ভূমিকা’, ‘ও তরঙ্গ লাফাও’, ‘সামান্য এলিজি’ সহ কুড়িটির বেশি কাব্যগ্রন্থ। তাঁর লেখায় ছিল এক নিজস্ব স্বর, এক গভীর মানবিক উপলব্ধি। তাঁর কবিতা অনূদিত হয়েছে ইংরেজি ও হিন্দিতেও। পেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ কবিতা আকাদেমির সুভাষ মুখোপাধ্যায় সম্মাননা।
তবে রাহুল পুরকায়স্থ শুধু কবিতাতেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। তাঁর দ্বিতীয় প্রেম ছিল সাংবাদিকতা। জি ২৪ ঘণ্টা-র জন্মলগ্নে তিনি ছিলেন এক অন্যতম মুখ। পরে TV9 বাংলা-র কনসাল্টিং এডিটর হিসেবেও যুক্ত ছিলেন। সংবাদের ভাষাকে তিনি শুধু তথ্য নয়, ভাবনারও বাহক করে তুলেছিলেন।
জন্ম ১৯৬৪ সালের ৬ ডিসেম্বর, কলকাতায়। বেড়ে ওঠা বেলঘরিয়ায়। পৈতৃক ভিটে ছিল শ্রীহট্টে। সত্তর-আশির রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক উত্তাপ তাঁর লেখায় ছিল স্পষ্টভাবে অনুরণিত।
আজ শব্দেরা নিস্তব্ধ, কাগজে আর নতুন কবিতা আসবে না। কিন্তু রাহুল পুরকায়স্থের লেখা, তাঁর স্বর, তাঁর লড়াই—এই সবই থেকে যাবে আমাদের মধ্যে। তাঁর কবিতা, তাঁর সংবাদ বিশ্লেষণ, তাঁর উপস্থিতি — সবটাই হয়ে উঠেছে আমাদের collective memory-র এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাহুল নেই, কিন্তু তাঁর তৈরি করা ভাষার আলো এখনও জ্বলছে, পাঠকের মনে, প্রতিটি বাক্যের গভীরে।
