বিজ্ঞান
ডিম্বাণুই বেছে নেয় ‘যোগ্য’ শুক্রাণু! ভাঙল শতাব্দীপ্রাচীন ‘শুক্রাণু প্রতিযোগিতা’র মিথ
শুক্রাণু আর ডিম্বাণুর মিলনের কাহিনী চিরকালই এক রূপকথার মতো শুনতে লাগে — রাজকুমারদের মতো লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু ছুটছে ঘোড়ায় চড়ে, শেষে একজন ‘বিজয়ী’ পৌছায় ঘুমন্ত ডিম্বাণুর দরজায়! কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান সেই চেনা কল্পছবিকে ভেঙে দিচ্ছে বারবার। বিজ্ঞান বলছে, বিজয়ী শুক্রাণু নিজে গিয়ে জয় ছিনিয়ে আনে না— বরং, ডিম্বাণুই তাকে বেছে নেয়।
বিজ্ঞান লেখিকা স্টার ভার্টনের সদ্য প্রকাশিত বই “The Stronger Sex: What Science Tells Us About the Power of the Female Body”-তে উঠে এসেছে এই বিস্ময়কর তথ্য। ডিম্বাণুর স্বকীয়তা, সচেতনতা এবং নির্বাচনক্ষমতার উপর আলোকপাত করে তিনি বুঝিয়ে দিয়েছেন, প্রকৃতির অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকা এই ‘নারী শক্তি’ কতখানি উপেক্ষিত হয়েছে যুগের পর যুগ।
ডিম্বাণুর বিশিষ্টতা:
নারীর শরীরে জন্মের আগেই তৈরি হয়ে যায় ১০-২০ লক্ষ ডিম্বাণু। বয়ঃসন্ধির পর সংখ্যাটা নেমে আসে প্রায় ৩-৪ লক্ষে, যার মধ্যে মাত্র ৩০০-৪০০টি ডিম্বাণুই প্রজননের উপযোগী হয়ে ওঠে। কিন্তু একবারে একটি মাত্র ডিম্বাণুই মুক্ত হয়, যা অপেক্ষা করে নিজের জন্য ‘উপযুক্ত’ শুক্রাণুর।
প্রফেসর লিনেট সিভার্ট (Massachusetts University) বলেন, মানুষ পুরুষেরা এখনও মাছের মতোই লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু তৈরি করে। কিন্তু তারা বেছে নেয় না—সব একসঙ্গে ছুঁড়ে দেয়। অন্যদিকে নারী শরীর হয় “খুঁতখুঁতে”। শুধুমাত্র যোগ্য শুক্রাণুই তার কাছে পৌঁছতে পারে।
বিজ্ঞান কী বলছে?
ডিম্বাণুর থেকে নির্গত রাসায়নিক পদার্থ শুক্রাণুর প্রতি আকর্ষণ তৈরি করে। কিন্তু এই সংকেত সব শুক্রাণুর জন্য নয়— নির্দিষ্ট ডিএনএ/প্রোটিন গঠনের শুক্রাণুই পায় সেই ডাক। অর্থাৎ, বেছে বেছে ডাকা হয় শুক্রাণুকে। এক একটি ডিম্বাণুর আলাদা পছন্দ, আলাদা বাছাইয়ের ধরণ। এই প্রক্রিয়াকে বলাই চলে “ডিম্বাণুর স্বয়ম্বর সভা”।
বিজ্ঞানের পথে সমাজচিন্তা:
‘শুক্রাণু দৌড়ায়, ডিম্বাণু অপেক্ষা করে’— এই বর্ণনা কতটা বিজ্ঞানভিত্তিক? গবেষক এমিলি মার্টিন ১৯৯১ সালের প্রবন্ধে দেখিয়েছেন, এই কাহিনিগুলোর উৎস মূলত সমাজের লিঙ্গবৈষম্যভাবনা। বহু ক্ষেত্রেই নারীর নিষ্ক্রিয়তা এবং পুরুষের কর্তৃত্বশীলতাকেই বিজ্ঞানের ব্যাখ্যায় রূপ দেওয়া হয়েছে।
জীবন সৃষ্টি হয় যৌথ সিদ্ধান্তে— কেবল গতিশীলতা নয়, প্রজননের নেপথ্যে লুকিয়ে আছে চয়ন, প্রত্যাখ্যান ও নিয়ন্ত্রণের বিজ্ঞান। আর সেই নিয়ন্ত্রণ অধিকাংশ সময়েই থাকে নারী শরীরের হাতে।
