বাংলাদেশ
বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ইউনুস সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনার ঝড়
ডিজিটাল ডেস্কঃ আওয়ামী লিগের (Awami League) উপর কার্যত নিষেধাজ্ঞা জারি করে ১০ মে মহম্মদ ইউনুস (Md Yunus) নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা নির্দেশিকাকে ‘বেআইনি’ ও ‘গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিপন্থী’ বলে অভিহিত করেছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (Human Rights Watch)। একইসঙ্গে ইউরোপের একাধিক মানবাধিকার সংগঠন ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (European Union) কাছে বাংলাদেশ পরিস্থিতিতে জরুরি হস্তক্ষেপের আবেদন জানিয়েছে।
‘গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করছে ইউনুস সরকার’ — হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
আমেরিকান মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ জানিয়েছে, শেখ হাসিনা (Sheikh Hasina) সরকারের অধীনে যেমন মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ছিল, তেমনই বর্তমান ইউনুস প্রশাসন তার দল আওয়ামী লিগের সমর্থকদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে। সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অপব্যবহার করে একটি রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা একান্তই নিন্দনীয় বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ-এর এশিয়া বিভাগের উপপরিচালক মীনাক্ষী গঙ্গোপাধ্যায় (Meenakshi Ganguly) বলেছেন, “আগের সরকার যেমন বিরোধীদের দমনে আইনের অপব্যবহার করেছে, বর্তমান সরকারও তেমনই আওয়ামী লিগের সমর্থকদের প্রতি দমননীতি গ্রহণ করেছে। এটি মৌলিক স্বাধীনতার চরম লঙ্ঘন।”
ইউরোপীয় মানবাধিকার সংগঠনগুলির কড়া বিবৃতি ও স্মারকলিপি
বাংলাদেশে চলমান পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলে বর্ণনা করে ইউরোপের একাধিক নাগরিক ও মানবাধিকার সংগঠন ইউরোপীয় ইউনিয়নকে চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই দেশে বেড়েছে রাজনৈতিক সহিংসতা, জেল হেফাজতে নির্যাতন, সংবাদমাধ্যমের উপর সেন্সর এবং সংখ্যালঘুদের উপর নিপীড়ন। ইসলামপন্থীদের হাতে বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেওয়া, মানুষ হত্যা—এসব ঘটনাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আখ্যা দেওয়া হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে ‘ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরাম’ (European Bangladesh Forum), ‘সাউথ এশিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোরাম’ (South Asia Democratic Forum), ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানি’ (Working Group Bangladesh in Germany), ও ‘আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্ক’ (Earth Civilization Network)–এর পক্ষ থেকে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা কমিশনার কাজা ক্যালাস (Kaja Kallas)-এর কাছে ১৬ পাতার একটি বিশদ স্মারকলিপি জমা দেওয়া হয়েছে।
‘সাংবাদিক, বিরোধী নেতাদের উপর চরম দমননীতি’
প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ১৬৭ জন সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল হয়েছে, প্রায় ১৪০ জন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। ‘প্রথম আলো’ (Prothom Alo) ও ‘দ্য ডেইলি স্টার’ (The Daily Star)-এর মতো শীর্ষ সংবাদমাধ্যমের উপর চরম চাপ তৈরি করা হয়েছে।
এছাড়া খ্যাতনামা লেখক ও সাংবাদিক শাহরিয়ার কবীর (Shahriar Kabir)-কে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়েছে এবং তাঁকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিষেবাও দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে।
বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গণপিটুনি নিয়ে উদ্বেগ
চিঠিতে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে ফেব্রুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত অন্তত ২১ জন ব্যক্তি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হয়েছেন। একই সময়ে গণপিটুনিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরও ১২৩ জন। সংগঠনগুলির দাবি, এসব ঘটনায় স্বাধীন তদন্ত হওয়া উচিত এবং দোষীদের বিরুদ্ধে স্বচ্ছ বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে।
‘ইউরোপীয় ইউনিয়নের উচিত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া’
চিঠির শেষে সংগঠনগুলি উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ এখন গভীর সংকটে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দেশে মৌলিক অধিকার, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার অস্তিত্ব বিপন্ন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত তৎপর হয়ে কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করা ও স্পষ্ট বার্তা দেওয়া—গণতন্ত্র ও মানবাধিকার নিয়ে আপস করা হবে না।
এই বিবৃতিতে সাক্ষর করেছেন ইউরোপিয়ান বাংলাদেশ ফোরামের (UK) যোগাযোগ পরিচালক ক্রিস ব্ল্যাকবার্ন (Chris Blackburn), সাউথ এশিয়া ডেমোক্র্যাটিক ফোরামের (Brussels) নির্বাহী পরিচালক পাওলো কাসাকা (Paulo Casaca), ওয়ার্কিং গ্রুপ বাংলাদেশ ইন জার্মানির (Germany) ক্লাউস স্টেপেল (Klaus Stäpel) এবং আর্থ সিভিলাইজেশন নেটওয়ার্কের (Turkey) প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়ক তারিক গুনেরসেল (Tarik Günersel)।
তাঁরা সকলেই একবাক্যে জানিয়েছেন, বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে বাঁচাতে হলে এখনই আন্তর্জাতিক হস্তক্ষেপ একান্ত জরুরি।
