ফ্যাটি লিভার: বাড়তি চর্বি থেকে সাবধান! লক্ষণ না থাকলেও হতে পারে বড় বিপদ
Connect with us

স্বাস্থ্য

ফ্যাটি লিভার: বাড়তি চর্বি থেকে সাবধান! লক্ষণ না থাকলেও হতে পারে বড় বিপদ

অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার ও পরিশ্রমহীন জীবনের কারণে বাড়ছে ফ্যাটি লিভার। কেন এই রোগকে নীরব ঘাতক বলা হয় এবং কীভাবে ঘরোয়া উপায়ে যকৃত সুস্থ রাখবেন, তা জেনে নিন এই প্রতিবেদনে।

Dipa Chakraborty

Published

on

চিকিৎসা ডেস্ক, ডাঃ সোমনাথ দত্ত –  বর্তমান সময়ে ফ্যাটি লিভার (Fatty Liver) এমন একটি রোগ, যা নিঃশব্দে শরীরের ভেতরে বড় ধরনের ক্ষতি করে চলেছে। সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই রোগের কোনো স্পষ্ট লক্ষণ বা উপসর্গ (Symptoms) থাকে না। মানুষ স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে থাকেন, অথচ ভেতরে ভেতরে যকৃতের কোষে চর্বি জমতে জমতে একসময় তা মারাত্মক পর্যায়ে পৌঁছে যায়। আজকের দ্রুতগতির জীবনযাত্রা, ভুল খাদ্যাভ্যাস, শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং মানসিক চাপ (Stress) – সব মিলিয়ে ফ্যাটি লিভার এখন শহর ও গ্রাম উভয় এলাকাতেই একটি সাধারণ কিন্তু বিপজ্জনক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে।

ফ্যাটি লিভার আসলে কী? ফ্যাটি লিভার হলো এমন একটি অবস্থা, যেখানে যকৃতের কোষে স্বাভাবিকের তুলনায় অতিরিক্ত চর্বি (Fat) জমা হতে শুরু করে। সাধারণভাবে লিভারে সামান্য পরিমাণ চর্বি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু যখন লিভারের মোট ওজনের ৫ থেকে ১০ শতাংশের বেশি চর্বি জমে যায়, তখন তাকে চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় ফ্যাটি লিভার বলা হয়।

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে ফ্যাটি লিভার প্রধানত দুই প্রকারের হয়: ১. নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (NAFLD) ২. অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার ডিজিজ (AFLD)

বর্তমানে সবচেয়ে বেশি দেখা যায় নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার, যেখানে রোগীর মদ্যপানের অভ্যাস না থাকলেও লিভারে চর্বি জমে।

Advertisement
ads

লক্ষণ না থাকলেও কেন এটি বিপজ্জনক? ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো প্রাথমিক ও মাঝারি পর্যায়ে কোনো লক্ষণ না থাকা। অনেক রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ অনুভব করেন এবং দৈনন্দিন কাজকর্মে কোনো অসুবিধা হয় না। শুধুমাত্র রুটিন আল্ট্রাসনোগ্রাফি (USG) বা রক্ত পরীক্ষায় ধরা পড়ে যে লিভারে চর্বি জমেছে। এই নীরব অবস্থার কারণেই বহু মানুষ বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না।

কিন্তু সঠিক সময়ে চিকিৎসা না নিলে এটি ধীরে ধীরে মারাত্মক রূপ নিতে পারে:

  • লিভারের প্রদাহ (Steatohepatitis)

  • ফাইব্রোসিস (Fibrosis)

  • সিরোসিস (Cirrhosis)

  • লিভার ফেইলিওর (Liver Failure)

  • এমনকি লিভার ক্যান্সার (Liver Cancer) পর্যন্ত হতে পারে।

সম্ভাব্য কিছু লক্ষণ যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রে লক্ষণ থাকে না, তবুও কিছু মানুষের মধ্যে কিছু সাধারণ সমস্যা দেখা দিতে পারে:

  • সব সময় ক্লান্তি (Fatigue) অনুভব করা।

  • পেটের ডান দিকে ভারী ভাব বা অস্বস্তি।

  • হজমের সমস্যা ও পেট ফাঁপা (Bloating)।

  • ক্ষুধামান্দ্য বা খাওয়ার অনিচ্ছা।

  • সকালে মুখ তেতো লাগা।

ফ্যাটি লিভারের প্রধান কারণসমূহ মূলত আধুনিক জীবনযাপনের নানা ত্রুটি এই রোগের জন্য দায়ী। যেমন:

Advertisement
ads
  • অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার এবং ফাস্ট ফুড (Fast Food) খাওয়া।

  • চিনি ও মিষ্টি জাতীয় পানীয় বা সফট ড্রিঙ্কস।

  • শারীরিক পরিশ্রমের অভাব এবং স্থূলতা (Obesity)।

  • ডায়াবেটিস (Diabetes) ও উচ্চ কোলেস্টেরল।

  • দীর্ঘদিন কিছু বিশেষ ওষুধ সেবন এবং মানসিক অস্থিরতা।

আয়ুর্বেদের দৃষ্টিতে ফ্যাটি লিভার আয়ুর্বেদ শাস্ত্র মতে, ফ্যাটি লিভার মূলত কফ দোষের আধিক্য এবং মেদ ধাতুর বিকৃতির কারণে হয়। যখন আমাদের হজম ক্ষমতা বা ‘অগ্নি’ (Digestive Fire) দুর্বল হয়, তখন খাবার ঠিকমতো হজম হয় না এবং শরীরে ‘আম’ বা অপাচ্য বিষ (Toxins) সৃষ্টি হয়। এই বিষাক্ত উপাদান যকৃতের কার্যক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং চর্বি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

ফ্যাটি লিভারের গ্রেড (Grades) আধুনিক চিকিৎসা অনুযায়ী একে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়:

  • Grade 1: সামান্য চর্বি জমা। সঠিক খাদ্যাভ্যাস ও ব্যায়ামের মাধ্যমে এটি সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলা সম্ভব।

  • Grade 2: মাঝারি চর্বি জমা।

  • Grade 3: গুরুতর অবস্থা, যা উচ্চ ঝুঁকি বহন করে।

প্রতিকার: খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপন লিভার সুস্থ রাখতে লাউ, ঝিঙে, করলা, পটল এবং সবুজ শাকসবজি খাদ্যতালিকায় রাখুন। সেদ্ধ বা হালকা রান্না করা খাবার এবং আমলকি যকৃতের জন্য অত্যন্ত উপকারী। এড়িয়ে চলতে হবে ভাজাভুজি, অতিরিক্ত ভাত এবং মিষ্টি জাতীয় খাবার। আয়ুর্বেদ মতে, খাবার হওয়া উচিত লঘু ও সহজপাচ্য।

পাশাপাশি নিয়মিত যোগব্যায়াম (Yoga) যেমন ভুজঙ্গাসন, ধনুরাসন এবং কপালভাতি প্রাণায়াম লিভারের চর্বি কমাতে জাদুর মতো কাজ করে। প্রতিদিন অন্তত ৩০ থেকে ৪৫ মিনিট দ্রুত হাঁটা (Brisk Walking) জরুরি।

Advertisement
ads

যকৃত শরীরের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা যেমন LFT, Lipid Profile এবং USG করার মাধ্যমে সচেতন থাকা সম্ভব। মনে রাখবেন, রোগ হওয়ার পর চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধই (Prevention) উত্তম।

Continue Reading
Advertisement