রাজনীতি
রাজ্য বিধানসভায় পেশ ওবিসি সংরক্ষণ সংশোধনী বিল! নাম অন্তর্ভুক্ত ও বাদ দেওয়া নিয়ে বড় সিদ্ধান্ত
তীব্র রাজনৈতিক তরজার মাঝে ১৮৬ ভোটে পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় পাশ হলো ওবিসি সংরক্ষণ সংশোধনী বিল। ওবিসি তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তি ও বাদ দেওয়া নিয়ে কমিশনকে দেওয়া হলো বিশেষ আইনি ক্ষমতা।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় (West Bengal Assembly) পাশ হয়ে গেল ওবিসি (OBC) ও অন্যান্য অনগ্রসর সম্প্রদায়ের সংরক্ষণ সংক্রান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি সংশোধনী বিল (OBC Reservation Bill)। সোমবার বিধানসভার অধিবেশনে রাজ্যের অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ মন্ত্রী গৌরীশঙ্কর ঘোষ এই বিল দুটি পেশ করেন। প্রাথমিক স্তরে বিল দুটি ধ্বনিভোটে পাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও, আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি (Naushad Siddiqui) বিলের বিরোধিতা করে সরাসরি ভোটাভুটির (ডিভিশন) দাবি জানান। বিধানসভার স্পিকার রথীন্দ্র বোস এই দাবিতে সম্মতি দিলে কক্ষের ভেতরে ভোটাভুটি প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এই ভোটাভুটিতে শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেস অংশ নিলেও, দলের ভেতরে থাকা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিধায়কদের একাংশ ক্ষুব্ধ হয়ে কক্ষত্যাগ (Walkout) করেন। তীব্র রাজনৈতিক টানাপোড়েনের পর শেষ পর্যন্ত বিলের পক্ষে ১৮৬টি এবং বিপক্ষে ১৭টি ভোট পড়ে। এছাড়া ৬ জন বিধায়ক এই ভোটদান প্রক্রিয়া থেকে সম্পূর্ণ বিরত ছিলেন। বিধানসভায় পাশ হওয়া এই নতুন সংশোধনী বিলের মাধ্যমে ওবিসি তালিকাভুক্তি ও কমিশনের অন্দরমহলে একাধিক বড় পরিবর্তন আসতে চলেছে।
সরকারি গেজেটে (Gazette) প্রকাশিত তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে, এই প্রস্তাবিত সংশোধনী বিলের মাধ্যমে অনগ্রসর শ্রেণী কমিশনের শীর্ষস্তরের প্রশাসনিক বিন্যাসে বড়সড় রদবদল আনা হচ্ছে। বিলের ২ নম্বর ধারায় মূল আইনের ৩ নম্বর ধারার (২) উপধারার (ডি) পরিচ্ছেদটি সংশোধন করা হয়েছে।
আগের নিয়ম অনুযায়ী, কমিশনের সচিব হিসেবে কেবল ‘একজন সচিব’ (A Secretary) নিয়োগের আইনি বিধান ছিল। নতুন সংশোধনীতে সেই নিয়ম বদলে দিয়ে ‘একজন যুগ্ম সচিব বা তদূর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তা’ (A Joint Secretary or above) পদাধিকারীকে সচিব হিসেবে নিয়োগ করার কথা বলা হয়েছে। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই পরিবর্তনের ফলে কমিশনের প্রশাসনিক কাজে অত্যন্ত অভিজ্ঞ ও উচ্চপদস্থ আমলাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত হবে, যা ওবিসি তালিকা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়াকে আরও গতিশীল, স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত (Error-free) করবে।
কমিশনের সদস্যদের স্থায়িত্ব এবং তাঁদের পদের মেয়াদ নিয়েও এই সংশোধনী বিলে একটি সুনির্দিষ্ট আইনি রূপরেখা স্পষ্ট করা হয়েছে। বিলের ৩ নম্বর ধারায় মূল আইনের ৪ নম্বর ধারার (১) উপধারাটি সম্পূর্ণ প্রতিস্থাপন (Replacement) করার প্রস্তাব আনা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কমিশনের প্রত্যেক সদস্য তাঁদের কার্যভার বা দায়িত্ব গ্রহণের দিন থেকে নির্দিষ্ট ৩ (তিন) বছরের মেয়াদের (Tenure) জন্য পদে অধিষ্ঠিত থাকবেন। তবে, যে ‘সদস্য সচিব’ (Member Secretary) রাজ্য সরকারের চাকুরিজীবী বা রাজ্য প্রশাসনের প্রত্যক্ষ অধীনে কর্মরত থাকবেন, তাঁর পদের মেয়াদ এই তিন বছরের সাধারণ নিয়মে বাঁধা থাকবে না। তাঁর ক্ষেত্রে রাজ্য সরকার নিজস্ব আদেশের (Order) মাধ্যমে সময়সীমা আলাদাভাবে সুনির্দিষ্ট করে দেওয়ার এক্তিয়ার নিজের হাতে রেখেছে।
বিলের ৪ নম্বর ধারায় মূল আইনের ৯ নম্বর ধারাটিকে সম্পূর্ণ বদলে ফেলে কমিশনকে সুনির্দিষ্ট কিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও এক্তিয়ার (Jurisdiction) প্রদান করা হয়েছে:
১. তালিকাভুক্তির আবেদন পর্যালোচনা: দেশের যেকোনো নাগরিক গোষ্ঠী বা শ্রেণীকে অনগ্রসর হিসেবে তালিকায় নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আসা আবেদন বা দাবিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করবে কমিশন। সেই অনুযায়ী রাজ্য সরকারকে প্রয়োজনীয় ও উপযুক্ত পরামর্শ (Advice) প্রদান করবে তারা।
২. অভিযোগের শুনানি: অনগ্রসর তালিকায় কোনো শ্রেণীর অতিরিক্ত বা ভুল অন্তর্ভুক্তি (Over-inclusion) কিংবা প্রকৃত যোগ্য কোনো শ্রেণীর বাদ পড়ে যাওয়া (Under-inclusion) সংক্রান্ত নাগরিকদের যেকোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগের সরাসরি শুনানি (Hearing) করার বিশেষ এক্তিয়ার দেওয়া হয়েছে কমিশনকে। এর ফলে ওবিসি তালিকা নিয়ে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ বা অসঙ্গতি দূর করা অনেক সহজ হবে।
