রাজনীতি
ওবিসি সংরক্ষণ সংশোধন বিল ২০২৬: বিধানসভায় তৃণমূল-বাম আমলের তালিকা বাতিলের পথে বিজেপি সরকার
পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি সংরক্ষণ নিয়ে বড় পদক্ষেপ রাজ্য সরকারের। বাম ও তৃণমূল জমানার তৈরি করা ওবিসি তালিকা বাতিল করতে বিধানসভায় পেশ হলো জোড়া সংশোধনী বিল। মুসলিম তোষণের রাজনীতি বন্ধ করে প্রকৃত অনগ্রসরদের অধিকার ফেরানোর দাবি শাসক শিবিরের, তীব্র বিরোধিতা আইএসএফ ও তৃণমূলের।
কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে ওবিসি (OBC) সংরক্ষণের চেনা সমীকরণ বদলে দিতে বিধানসভায় (Assembly) পেশ হলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জোড়া সংশোধনী বিল। বর্তমান সরকারের দাবি, বিগত বামফ্রন্ট ও তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির কারণে হিন্দুদের বঞ্চিত করে মুসলমানদের যেভাবে সংরক্ষণের সুবিধা দেওয়া হয়েছিল—সেই ‘ঐতিহাসিক ভুল’ সংশোধন করতেই এই পদক্ষেপ।
সোমবার বিধানসভায় অনগ্রসর শ্রেণিকল্যাণ মন্ত্রী (Backward Classes Welfare Minister) গৌরীশংকর ঘোষ বিল দু’টি পেশ করেন। বিল দু’টির নাম হলো—
-
‘দ্য ওয়েস্ট বেঙ্গল ব্যাকওয়ার্ড ক্লাসেস (আদার দ্যান SC অ্যান্ড ST) রিজার্ভেশন অফ ভ্যাকেন্সিস ইন সার্ভিসেস অ্যান্ড পোস্টস অ্যামেন্ডমেন্ট বিল, ২০২৬’
-
‘পশ্চিমবঙ্গ অনগ্রসর শ্রেণি কমিশন (সংশোধন) বিল, ২০২৬’।
নতুন বিলে কী ধরণের পরিবর্তনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে?
নতুন এই সংশোধনী বিলে ওবিসি সংরক্ষণের তালিকায় থাকা তফশিল বা শিডিউল ওয়ান (Schedule 1) সম্পূর্ণ বাদ দিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব (Proposal) দেওয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, তৃণমূল জমানার তৈরি আইনে ওবিসি ক্যাটেগরি ‘এ’-র আওতায় ৬৫টি এবং ক্যাটেগরি ‘বি’-র আওতায় ৭৮টি জনগোষ্ঠী (Community) তালিকাভুক্ত ছিল। এই সম্পূর্ণ তালিকাটিই বাতিলের পথে হাঁটছে সরকার। এর পাশাপাশি, অনগ্রসর কমিশনে (Backward Classes Commission) কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর নাম অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার বিষয়ে সাধারণ মানুষের আপত্তি (Objection) জানানোর আইনি সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন সংশোধনীতে।
ওবিসি সংরক্ষণের ইতিহাস
অতীতে রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশনের (Ranganath Misra Commission) রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গে প্রথম ওবিসি সংরক্ষণ ব্যবস্থা চালু করেছিল তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার। অনগ্রসরতার নিরিখে তখন ‘ক্যাটেগরি এ’ এবং ‘ক্যাটেগরি বি’—এই দুটি ভাগ তৈরি করে যথাক্রমে ১০% ও ৭% সংরক্ষণের (Reservation) ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে ক্ষমতায় এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার ওই আইন সংশোধন করে এবং এই দুই ক্যাটেগরিতে মোট ১৪৩টি জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে, যার মধ্যে বড় অংশই ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের। এমনকি তফশিলি জাতি (Scheduled Caste) থেকে ধর্মান্তরিত খ্রিস্টানদেরও ক্যাটেগরি ‘বি’-তে স্থান দেওয়া হয়েছিল।
রাজনৈতিক তরজা ও ক্ষোভ
বিজেপির দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, পূর্বতন তৃণমূল সরকার কেবল মুসলিম তোষণের (Muslim Appeasement) জন্য হিন্দুদের ন্যায্য অধিকার কেড়ে নিয়েছিল। এই প্রসঙ্গে বিধানসভায় জয়নগরের বিধায়ক বিশ্বনাথ দাস বলেন,
“শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্কের স্বার্থে মুসলমানদের তোষণ করতে এই অন্যায় করা হয়েছিল। আমরা সেই ভুল শুধরে নিতে চাই, যাতে প্রকৃত অনগ্রসর শ্রেণি কোনোভাবেই বঞ্চিত (Deprived) না হয়।”
অন্যদিকে, এই বিলের তীব্র বিরোধিতা (Opposition) করেছে বিরোধী শিবির। ভাঙড়ের আইএসএফ (ISF) বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকি বিলটিকে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক হাতিয়ার বলে কটাক্ষ করেছেন। তিনি বলেন,
“এই বিলটির কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা (Scientific Explanation) নেই। এর ফলে অনগ্রসর শ্রেণির মধ্যে বিভেদ আরও বাড়বে। রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতির (Socio-Economic Condition) নিরিখে সংরক্ষণ করা উচিত ছিল।”
একই সুরে জলঙ্গির তৃণমূল বিধায়ক বাবর আলিও এই ওবিসি সংশোধনী বিলের প্রাসঙ্গিকতা (Relevance) নিয়ে প্রশ্ন তুলে সরব হয়েছেন। বিলটিকে কেন্দ্র করে বর্তমানে রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
