রাজনীতি
ইউসিসি বিলের প্রস্তুতিতে জাস্টিস রঞ্জনা দেশাই কমিটি: ৪ সপ্তাহে রিপোর্ট জমার নির্দেশ মুখ্যমন্ত্রীর
বাংলায় ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা ইউসিসি বিল নিয়ে বড় আপডেট। আগামী ২ অগস্ট মন্ত্রিসভায় পেশ হবে খসড়া। আদিবাসী ও কুড়মিদের এই আইনের বাইরে রেখে আগস্ট মাসেই বিল পাসের লক্ষ্য রাজ্য সরকারের।
পশ্চিমবঙ্গে দীর্ঘপ্রত্যাশিত ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি’ বা ইউনিফর্ম সিভিল কোড (UCC) আইন প্রণয়ন নিয়ে এবার বড়সড় পদক্ষেপ করল রাজ্য সরকার। সোমবার বিধানসভার কক্ষে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানিয়ে দিলেন, বাংলায় এবার থেকে সকলের জন্য একটিই সাধারণ আইন বলবৎ হবে এবং ধর্মের ভিত্তিতে আলাদা আলাদা আইনের দিন শেষ হতে চলেছে। বিরোধী বেঞ্চের তীব্র হইহট্টগোলের মধ্যেই মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট করে দেন যে, এই বিল পাসের বিষয়ে তাঁদের সরকার সম্পূর্ণ সংকল্পবদ্ধ। আগামী ২ অগস্ট রাজ্য মন্ত্রিসভার বা ক্যাবিনেটের (Cabinet) বৈঠকে এই প্রস্তাবিত বিলের খসড়া অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।
মুখ্যমন্ত্রী জানান, এই আইনের খসড়া একেবারে শূন্য থেকে তৈরি হচ্ছে না। মূলত দেশের তিনটি রাজ্যের সফল আইনি রূপরেখাকে মডেল (Model) বা আদর্শ হিসেবে সামনে রেখে পশ্চিমবঙ্গের বিলটি সাজানো হয়েছে। এই তিনটি মডেল হলো— উত্তরাখণ্ড ইউসিসি অ্যাক্ট ২০২৪, আসাম ইউসিসি বিল ২০২৬ এবং গুজরাত ইউসিসি বিল ২০২৬।
তবে উত্তরাখণ্ড বা আসামের মতোই পশ্চিমবঙ্গের এই প্রস্তাবিত বিলে রাজ্যের প্রাচীন জনজাতিদের নিজস্ব সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও আবেগকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেন যে, আদিবাসী, কুড়মি এবং মূলবাসী সম্প্রদায়ের মানুষদের এই অভিন্ন দেওয়ানি বিধির পরিধির বাইরে রাখা হচ্ছে। ফলে এই আইন কার্যকর হলেও তাদের নিজস্ব সামাজিক নিয়মে কোনো হস্তক্ষেপ করা হবে না।
আইনটি চূড়ান্ত করার আগে রাজ্যের সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি রঞ্জনা প্রকাশ দেশাইয়ের চেয়ারপার্সনশিপে (Chairpersonship) একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিয়েছে রাজ্য সরকার। এই কমিটির গঠনশৈলী হবে নিম্নরূপ:
-
চেয়ারপার্সন: জাস্টিস রঞ্জনা দেশাই (অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, সুপ্রিম কোর্ট)।
-
সদস্যবৃন্দ: একজন অবসরপ্রাপ্ত আইএএস (IAS) অফিসার, একজন আইনি বিশেষজ্ঞ, একজন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ এবং একজন সমাজকর্মী।
-
সদস্য সচিব: সাধারণ প্রশাসন দফতরের বা জিএডি (GAD)-এর একজন অতিরিক্ত সচিব (Additional Secretary)।
এই বিশেষ টাস্ক ফোর্স বা কমিটিকে রাজ্যের প্রচলিত বিভিন্ন পার্সোনাল ও ফ্যামিলি ল’ বা পারিবারিক আইনের ওপর একটি পুঙ্খানুপুঙ্খ ও বিজ্ঞানসম্মত সমীক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। মূলত বিবাহ (Marriage), বিবাহবিচ্ছেদ (Divorce), খোরপোশ (Maintenance), উত্তরাধিকার ও সম্পত্তি বণ্টন (Succession), দত্তক নেওয়া (Adoption) এবং লিভ-ইন রিলেশনশিপ (Live-in Relationship)-সহ মোট ৭ থেকে ৯টি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বিষয়ের ওপর এই কমিটি কাজ করবে।
মুখ্যমন্ত্রী বিধানসভায় আশ্বাস দিয়ে জানান, এই কমিটিকে সমস্ত দিক খতিয়ে দেখে রিপোর্ট জমা দেওয়ার জন্য মাত্র চার সপ্তাহের সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। আগামী আগস্টের ‘ক্রান্তি মাসে’ কমিটির চূড়ান্ত সুপারিশ হাতে পাওয়ার পরেই বিধানসভায় ‘অভিন্ন দেওয়ানি বিধি বিল’ পেশ করা হবে এবং তা দ্রুত সমগ্র রাজ্যে কার্যকর করা হবে।
বিরোধী বিধায়কদের উদ্দেশে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আপনাদের যদি কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা বক্তব্য থাকে, তবে তা আপনারা জাস্টিস রঞ্জনা দেশাই কমিটির কাছে লিখিতভাবে জমা দিতে পারেন। কিন্তু মনে রাখবেন, আমরা আমাদের নির্বাচনী সংকল্পপত্রে লিখেছিলাম যে বাংলায় ইউসিসি কার্যকর হবেই, আর আমরা সেই সংকল্প পূরণ করতে চলেছি। এটি কার্যকর হবেই।”
