রায়গঞ্জ
উদয়পুর দীপালি উৎসবে নাটকের জয়যাত্রা: একাকীত্ব থেকে সামাজিক শোষণ, মঞ্চে উঠে এল জীবনের নানা রং
রায়গঞ্জ: সাংস্কৃতিক ঔজ্জ্বল্যে ভাস্বর হয়ে উঠল উদয়পুর দীপালি উৎসব। উদয়পুর উদয়ন স্পোর্টিং ক্লাব পরিচালিত এই উৎসবে গত ২৩ ও ২৪ অক্টোবর, বৃহস্পতি ও শুক্রবার, মঞ্চস্থ হলো চারটি ভিন্ন স্বাদের নাটক, যা দর্শকদের সামনে তুলে ধরল সমাজ এবং সম্পর্কের গভীরে লুকিয়ে থাকা নানা জটিলতা। প্রতিটি নাট্যদল তাদের বলিষ্ঠ অভিনয় ও ভাবনা দিয়ে প্রমাণ করলো যে রাজ্যের নাট্যজগৎ কতটা প্রাণবন্ত।
প্রথম দিনের পরিবেশনা:
সম্পর্ক ও বর্বরতায় আলোকপাত
উৎসবের প্রথম দিন, ২৩ অক্টোবর, বৃহস্পতিবার, মঞ্চস্থ হয় দুটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ নাটক।
দিনের প্রথম নাটকটি ছিল ‘শিল্পাঙ্গন নাট্য সংস্থা’ নিবেদিত “অবজ্ঞাত শর্বরী”, যার পরিচালনায় ছিলেন বিশিষ্ট নাট্য ব্যক্তিত্ব শ্রী বিমল কুমার শীল। নাটকটির মূল বিষয়বস্তু ছিল একাকীত্ব যা কেবল একজন ব্যক্তির জীবনে নয়, বরং একটি সম্পর্কের মধ্যেও প্রবেশ করে। এর ভয়াবহ পরিণতি কী হতে পারে, তা নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে এই নাটকের মাধ্যমে। বহুবছর ধরে নাটকের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে সাধারণের কাছে তুলে ধরায় শ্রী শীলের বিশেষ ভূমিকা অনস্বীকার্য। আগামী দিনে রাজ্য ও দেশজুড়ে থিয়েটার কালচার প্রসারের জন্য তাঁর বিশেষ ভাবনা ও উদ্যোগ রয়েছে।
এরপর মঞ্চস্থ হয় ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সৃজন শাখা’ কর্তৃক নিবেদিত নাটক “সদগতি”। এই নাটকের মূল বক্তব্য ছিল সমাজের গভীর ক্ষত মধ্যযুগীয় বর্বরতা এবং উঁচু স্তরের মানুষের দ্বারা নিম্নবিত্তদের ওপর ক্রমাগত নিপীড়ন ও শোষণ। সমাজের এই বিভেদ ও অত্যাচারকে শৈল্পিক অথচ তীব্রভাবে দর্শকদের সামনে তুলে ধরে দলটি।
দ্বিতীয় দিনের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই
পরের দিন, ২৪ অক্টোবর, শুক্রবার, নাটকের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে মঞ্চস্থ হয় আরও দুটি শক্তিশালী প্রযোজনা।
দ্বিতীয় দিনের প্রথম পরিবেশনা ছিল ‘জাগরী নাট্য সংস্থা’ র নাটক “বন্দী যে জন”। এই নাটকের মূল ভাবনায় উঠে আসে জেনারেশন গ্যাপ (প্রজন্মের ব্যবধান)। প্রবীণ এবং নবীন প্রজন্মের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কীভাবে তাদের সম্পর্ক ও জীবনকে প্রভাবিত করে, সেই মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন অত্যন্ত সংবেদনশীলতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে।
দ্বিতীয় দিনের দ্বিতীয় এবং সমাপনী নাটকটি ছিল ‘উন্মুক্ত নাট্যদল’ নিবেদিত “মায়া লাগে নিজের জন্যে”। এই নাটকটি সমাজের এক শ্রেণির মানুষের দ্বারা অপর শ্রেণির দুঃখ-দুর্দশার সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর ক্রমাগত অত্যাচার, নিপীড়ন, এবং বিশ্বাসঘাতকতার চিত্র তুলে ধরে। এর পাশাপাশি, সমাজের প্রতিকূল পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে একজন নারীর বেঁচে থাকার কঠিন সংগ্রামও এই নাটকের একটি অন্যতম দিক।
অভিনয়ের উৎকর্ষতা ও ভবিষ্যতের বার্তা
উৎসবের প্রতিটি নাট্যদল তাদের অভিনয়, মঞ্চসজ্জা এবং সার্বিক উপস্থাপনার মাধ্যমে নিজেদের অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় দিয়েছে। সামাজিক দায়বদ্ধতা থেকে শুরু করে মানবিক সম্পর্কের জটিলতা, জীবন ও সমাজের বহু স্তরকে মঞ্চের ভাষায় পরিবেশন করে তারা দর্শকদের মন জয় করে নিয়েছে। এই সফল আয়োজন প্রমাণ করে যে উদয়পুরের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে নাটক ও থিয়েটারের ঐতিহ্য আজও সযত্নে লালিত হচ্ছে।
