উত্তর দিনাজপুর
উত্তর দিনাজপুর জেলার ক্রীড়া জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র দিলীপ কুমার বোস — জানুন তাঁর অনন্য অবদানের কাহিনি
উত্তর দিনাজপুর জেলার ক্রীড়া ইতিহাসে এক উজ্জ্বল নাম দিলীপ কুমার বোস — ফুটবল থেকে ব্যাডমিন্টন, প্রশিক্ষক থেকে সংগঠক — সর্বত্র তাঁর অবদান অমলিন।
উত্তর দিনাজপুর জেলার ক্রীড়া জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন রায়গঞ্জের মিলনপাড়ার বাসিন্দা শ্রী দিলীপ কুমার বোস (Dilip Kumar Bose)। তিনি শুধু এক দক্ষ ফুটবলার (Footballer) নন, বরং ক্রীড়া প্রশিক্ষক (Coach) ও সংগঠক (Sports Organizer) হিসেবেও রেখে গেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত।
১৯৪১ সালের ৩ জুলাই তৎকালীন অবিভক্ত বাংলার পূর্ব দিনাজপুর জেলার পাহারপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। পিতা রমেশচন্দ্র বোস (Ramesh Chandra Bose) ছিলেন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং মাতা রেনুকা বোস (Renuka Bose) ছিলেন গৃহবধূ। দেশভাগের (Partition of India) পর ১৯৪৯ সালে পরিবারসহ তিনি রায়গঞ্জে চলে আসেন এবং মিলনপাড়ায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।
গয়লাল হাই স্কুল (Goilal High School) থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করার পরই তিনি ক্রীড়াক্ষেত্রে পা রাখেন। ১৯৫৭ সালে রায়গঞ্জ একাদশের হয়ে প্রথমবার ফুটবল খেলেন এবং ধীরে ধীরে নিজেকে জেলার অন্যতম সেরা সেন্টার হাফ (Centre Half) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তাঁর সমসাময়িক ফুটবল খেলোয়াড়দের মধ্যে ছিলেন – ৺তিনু গুহ, ৺নিলু নাগ, ৺নারায়ণ চন্দ্র দাস, ৺বীরেন গুহ ও ৺গোপাল মহালনবিশ। দীর্ঘ সময় তিনি রায়গঞ্জ টাউন ক্লাব (Raiganj Town Club)-এর ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। রাজ্যের বিভিন্ন জেলা ও বাইরেও তাঁর ফুটবল দক্ষতা ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেছিল।
১৯৬৯ সালে তিনি ফুটবল প্রশিক্ষকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন এবং উত্তরবঙ্গ তথা রাজ্যজুড়ে বহু মেধাবী ফুটবলার তৈরি করেন। তাঁর প্রশিক্ষণে তৈরি হন অনু চৌধুরী, জগন্নাথ দে, সন্তোষ নন্দী, প্রদীপ চন্দ, পরিমল পোদ্দার, শ্যামল আইচ, নিতাই চন্দ্র দাস প্রমুখ, যারা কলকাতার নামকরা ক্লাবে খেলেছেন।
১৯৬৭ সালে তাঁর উদ্যোগে রায়গঞ্জ মহকুমা ক্রীড়া পরিষদ (Raiganj Sub-Division Sports Council) গঠিত হয়। এরপর ১৯৭৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন রায়গঞ্জ স্পোর্টস ক্লাব (Raiganj Sports Club), যার প্রথম সভাপতি ছিলেন তিনিই। তাঁর প্রচেষ্টায় ১৯৮৩ সালে মিলনপাড়ায় নয় বিঘা জমিতে ক্লাবের নিজস্ব খেলার মাঠ তৈরি হয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি সভাপতি পদে থেকে ক্লাবকে উত্তরবঙ্গের অন্যতম শক্তিশালী ফুটবল দলে পরিণত করেন। বর্তমানে তিনি ক্লাবের প্রধান পৃষ্ঠপোষক।
শুধু ফুটবলেই নয়, তিনি ব্যাডমিন্টন (Badminton) খেলাতেও সমান কৃতিত্ব দেখিয়েছেন। ১৯৮০-এর দশকে উত্তরবঙ্গ ব্যাডমিন্টন চ্যাম্পিয়ন (North Bengal Champion in Doubles) হন। ১৯৮৩ সালে ব্যাডমিন্টন প্রশিক্ষক হিসেবে শত শত খেলোয়াড়কে রাজ্য ও জাতীয় স্তরে গড়ে তুলেছেন। বিশিষ্ট ক্রীড়াবিদ ৺সরদিন্দু কিরণ দাসের (Saradindu Kiran Das) সঙ্গে যৌথভাবে তিনি গঠন করেন উত্তর দিনাজপুর ব্যাডমিন্টন অ্যাসোসিয়েশন (Uttar Dinajpur Badminton Association) এবং এখনও তিনি সংস্থার চিফ কোচ (Chief Coach)।
১৯৭৯ সালে রায়গঞ্জ স্টেডিয়াম (Raiganj Stadium) নির্মাণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৯২ সালে উত্তর দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা (Uttar Dinajpur District Sports Association) গঠনে ছিলেন অন্যতম স্থপতি এবং ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত কার্যকরী সভাপতি হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করেন।
পেশাগত জীবনে তিনি পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সেটেলমেন্ট ডিপার্টমেন্ট (Settlement Department)-এ চাকরি করেন এবং রায়গঞ্জ কর্নজোড়া শাখা থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
তাঁর সহধর্মিণী মিনতী বোস (Minati Bose) সর্বদা তাঁর পাশে থেকে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। পুত্র কল্লোল বোস (Kallol Bose) ও কন্যা মধুমিতা বোস (Madhumita Bose) বর্তমানে সুপ্রতিষ্ঠিত।
দীর্ঘ ক্রীড়াজীবনে তিনি উত্তর দিনাজপুর জেলা ক্রীড়া সংস্থা ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে একাধিক সম্মাননা (Award) পেয়েছেন। তাঁর অবদান আজও জেলার ক্রীড়া জগতকে অনুপ্রাণিত করে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তিনি অনুকরণীয় এক কিংবদন্তি।
