দেশের খবর
পরিবেশ ধ্বংসের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ
ডিজিটাল ডেস্কঃ বুধবার তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট নির্দেশ দেয় যে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of Hyderabad) কাছে ৪০০ একর সবুজ অঞ্চল সাফাইয়ের কাজ অবিলম্বে বন্ধ রাখতে হবে। আগামী বৃহস্পতিবারের শুনানি পর্যন্ত এই নির্দেশ বলবৎ থাকবে। এই রায় এমন এক সময়ে এল, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষকরা সরকারের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাচ্ছিলেন। রাজ্য সরকার কানচা গাচিবৌলি এলাকায় তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার জন্য ওই জমি নিলামে তোলার পরিকল্পনা করেছে।
- কে এই জমি পরিষ্কার করার নির্দেশ দিয়েছিল?
এই জমি পরিষ্কার করার সিদ্ধান্ত তেলেঙ্গানা রাজ্য সরকার নিয়েছিল। সরকারি যুক্তি ছিল যে, এই জমিটি কখনোই সংরক্ষিত বনভূমি ছিল না এবং এটি শিল্পের জন্য নির্ধারিত জমি। ২০০৩ সালে একটি বেসরকারি স্পোর্টস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানির ( ‘Sports Management Company’) কাছে এটি হস্তান্তর করা হয়েছিল, ফলে সরকার দাবি করছে যে এটি বনভূমি নয়। তেলেঙ্গানার অ্যাডভোকেট জেনারেল (AG) আদালতে যুক্তি দেন যে, জমিটি শিল্পের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল এবং এখানে গাছপালা থাকার অর্থ এই নয় যে এটি বনভূমি।
গত রবিবার থেকে তেলেঙ্গানা সরকারের উদ্যোগে ৫০টিরও বেশি বুলডোজার, খননযন্ত্র ও অন্যান্য ভূমি সমতলকারী যানবাহন ব্যবহার করে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিকটবর্তী ৪০০ একর জমির গাছপালা, ঝোপঝাড় এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক উপাদান ধ্বংস করা হচ্ছে। এই অঞ্চলটি বহু প্রজাতির জীববৈচিত্র্যে সমৃদ্ধ, যেখানে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের দেশীয় গাছপালা, ঔষধি গাছ, বিরল প্রজাতির পশু-পাখি, কীটপতঙ্গ ও সরীসৃপ। এই জমিটি শুধুমাত্র গাছপালার জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়, এটি আশেপাশের হ্রদগুলোর জলাধার এবং স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সরকারি অনুমোদনে আইটি পার্ক ও শিল্প এলাকা তৈরির লক্ষ্যে এই জমির গাছপালা কেটে ফেলা হচ্ছে, যা পরিবেশবিদদের মতে, জলবায়ুর ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে এবং অঞ্চলের ইকোসিস্টেম ধ্বংস করতে পারে। পরিবেশবিদরা দাবি করেছেন যে, এই এলাকা একটি প্রাকৃতিক বনাঞ্চলের বৈশিষ্ট্য বহন করে, যদিও এটি সরকারিভাবে বনভূমি হিসাবে ঘোষিত নয়। ফলে এই ধরনের নির্বিচার গাছ কাটা শুধুমাত্র পরিবেশ ধ্বংস নয়, এটি পরিবেশ সংরক্ষণ আইনেরও লঙ্ঘন। বিষয়টি নিয়ে পরিবেশবাদী সংগঠন, স্থানীয় ছাত্র ও শিক্ষকরা প্রতিবাদে নেমেছেন। যদিও তারা শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করছিলেন, কিন্তু পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে লাঠিচার্জ করেছে এবং এলাকায় বেড়া ও ব্যারিকেড স্থাপন করে গাছ কাটার কাজ চালিয়ে গেছে।
- ছাত্রদের প্রতিবাদ
সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা ধ্বংসের বিরুদ্ধে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শিক্ষকদের প্রতিবাদ তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত কয়েকদিন ধরেই তাঁরা এই অবৈধ গাছ কাটার বিরুদ্ধে সরব হলেও বুধবার তাঁদের প্রতিবাদ আরও সংঘটিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ইউনিয়ন ও শিক্ষকদের যৌথ উদ্যোগে প্রতিবাদ মিছিল বের করা হলে, সেটি পুলিশ বাধা দেয় এবং সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বুধবার সকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ব ক্যাম্পাসে একটি শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ মিছিলের আয়োজন করা হয়। মিছিলে অংশগ্রহণকারীরা গাছ কাটা বন্ধের দাবি তোলেন এবং সরকারের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানান। কিন্তু পুলিশ বিক্ষোভকারীদের রাস্তা অবরোধ করতে দেয়নি এবং ব্যারিকেড দিয়ে পথ আটকানোর চেষ্টা করে।বিক্ষোভকারী এক ছাত্র বলেন, “আমরা শান্তিপূর্ণভাবে আমাদের দাবির কথা জানাতে এসেছিলাম। কিন্তু পুলিশ আমাদের সঙ্গে অপরাধীদের মতো আচরণ করেছে। আমাদের কয়েকজন সহপাঠী আহত হয়েছেন এবং তাঁদের চিকিৎসার দরকার পড়েছে। আমরা এর ন্যায়বিচার চাই।”
- পুলিশের লাঠিচার্জ ও ছাত্রদের ওপর বলপ্রয়োগ
যখন ছাত্ররা পুলিশ ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, তখনই পুলিশের সঙ্গে তাঁদের সংঘর্ষ বাধে। পুলিশের পক্ষ থেকে লাঠিচার্জ করা হয়, যার ফলে বেশ কয়েকজন ছাত্র আহত হন। ছাত্রদের অভিযোগ, পুলিশ তাঁদের আন্দোলনকে দমন করতে অযথা বলপ্রয়োগ করেছে এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অনৈতিকভাবে শক্তি প্রয়োগ করা হয়েছে।
- বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া
এই ঘটনার পর, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক বাসুৎকর জগদীশ্বর রাও প্রতিবাদী ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন। তিনি জানান, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমি রক্ষা করার জন্য সকলের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। তিনি আরও বলেন, “এই বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি আমাদের অস্তিত্বের প্রতীক। এটি শুধু শিক্ষার জন্য নয়, পরিবেশ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সবাই মিলে চেষ্টা করব যাতে এই জমির মালিকানা রক্ষা করা যায় এবং পরিবেশ ধ্বংস না হয়।” বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরাও এই প্রতিবাদে ছাত্রদের পাশে দাঁড়িয়েছেন। পরিবেশবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও সরকারের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং এই ভূমি ধ্বংসের সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছেন।
- ছাত্রদের দাবিগুলি কী?
প্রতিবাদী ছাত্র ও শিক্ষকরা দাবি করেছেন—
-
৪০০ একর জমির গাছ কাটা ও সমতলকরণ অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে।
-
আইটি পার্ক নির্মাণের নামে পরিবেশ ধ্বংস করা চলবে না।
-
বিশ্ববিদ্যালয়ের জমির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেই রাখতে হবে।
-
পুলিশি হস্তক্ষেপ ও বলপ্রয়োগ বন্ধ করতে হবে এবং আহত ছাত্রদের উপযুক্ত চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
- হাইকোর্টের হস্তক্ষেপ
ছাত্রদের লাগাতার প্রতিবাদের প্রেক্ষিতে তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট সরকারের ভূমি সমতলকরণের কাজে স্থগিতাদেশ জারি করেছে এবং বিষয়টি পর্যালোচনা করে বৃহস্পতিবার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছে। আপাতত, হাইকোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী সমস্ত কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হবে এবং প্রশাসনকে এই ভূমির ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে ভাবতে হবে। এই সিদ্ধান্তে প্রতিবাদকারীরা সাময়িক স্বস্তি পেলেও তাঁরা বলেছেন, চূড়ান্ত রায় না পাওয়া পর্যন্ত তাঁদের আন্দোলন চলবে।
এখন দেখবার বিষয় আগামিকাল অর্থাৎ বৃহস্পতিবার তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট এর শুনানিতে কি রায় বের হয়।
