স্বাস্থ্য
নারীদের সাদা স্রাব ও অনিয়মিত মাসিক: কারণ, প্রতিকার ও সচেতনতা
সাদা স্রাব ও অনিয়মিত মাসিক কোনো লজ্জার বিষয় নয়। আধুনিক চিকিৎসা ও আয়ুর্বেদ শাস্ত্র কী বলে? জানুন এই সমস্যাগুলোর কারণ, লক্ষণ এবং ঘরোয়া সমাধান।
আমাদের সমাজে নারীদের স্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলা এখনো অনেকের কাছে আড়ষ্টতার বিষয়। বিশেষ করে সাদা স্রাব (White Discharge) এবং অনিয়মিত মাসিক নিয়ে ভুল ধারণা আর লজ্জার কারণে অনেক নারী ভেতরে ভেতরে কষ্ট পান। অথচ সঠিক সময়ে সচেতন হলে এই সমস্যাগুলো সহজেই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
১. সাদা স্রাব: কখন এটি স্বাভাবিক আর কখন উদ্বেগের?
যোনিপথ ও জরায়ুকে পরিষ্কার এবং আর্দ্র রাখতে সাদা স্রাব একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। তবে সব স্রাব স্বাভাবিক নয়।
| বৈশিষ্ট্য | স্বাভাবিক স্রাব | অস্বাভাবিক স্রাব (অসুস্থতা) |
| রঙ | স্বচ্ছ বা হালকা সাদা | হলদেটে, ধূসর বা ঘন সাদা |
| গন্ধ | কোনো দুর্গন্ধ থাকে না | কটু বা আঁশটে দুর্গন্ধ |
| শারীরিক অনুভূতি | কোনো অস্বস্তি হয় না | চুলকানি, জ্বালাপোড়া বা ব্যথা |
| অন্যান্য লক্ষণ | সাধারণত মাসিক চক্রের মাঝামাঝি বাড়ে | কোমর ব্যথা, দুর্বলতা ও ফ্যাকাশে ভাব |
২. অনিয়মিত মাসিক: চিনে নিন লক্ষণগুলো
সাধারণত একটি সুস্থ মাসিক চক্র ২১ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে হয় এবং তা ৩ থেকে ৭ দিন স্থায়ী হয়। এর বাইরে নিচের লক্ষণগুলো দেখা দিলে তাকে অনিয়মিত মাসিক বলা হয়:
-
মাসিক অনেক দেরিতে হওয়া বা ২-৩ মাস বন্ধ থাকা।
-
অতিরিক্ত রক্তপাত বা একেবারে নামমাত্র হওয়া।
-
মাসে দুবার মাসিক হওয়া।
৩. কেন এমন হয়? (আধুনিক ও আয়ুর্বেদিক দৃষ্টিভঙ্গি)
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের মতে: * হরমোনের ভারসাম্যহীনতা: PCOS/PCOD বা থাইরয়েডের সমস্যা।
-
সংক্রমণ: ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাল ইনফেকশন।
-
লাইফস্টাইল: অতিরিক্ত মানসিক চাপ, ঘুম কম হওয়া এবং ওজন বেড়ে যাওয়া।
-
অপরিচ্ছন্নতা: ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার অভাব ও দীর্ঘক্ষণ ভেজা কাপড় পরে থাকা।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মতে: আয়ুর্বেদে সাদা স্রাবকে ‘শ্বেতপ্রদর’ বলা হয়। এটি মূলত শরীরের ‘কফ দোষ’ এবং ‘রস ও মেদ ধাতুর’ বিকৃতির ফলে ঘটে। অন্যদিকে, অনিয়মিত মাসিক বা ‘আর্তবদুষ্টি’ হওয়ার প্রধান কারণ হলো হজম শক্তি বা ‘অগ্নি’ দুর্বল হওয়া এবং রক্তে দূষণ।
৪. খাদ্যাভ্যাস: সুস্থতার অর্ধেক পথ এখানেই
আপনার খাবারই আপনার ঔষধ হতে পারে।
-
যা খাবেন: টাটকা ও গরম খাবার, প্রচুর শাকসবজি, ডাল, আমলকি এবং দিনের বেলা অল্প টক দই।
-
যা বর্জন করবেন: অতিরিক্ত তেল-ঝাল-মশলা, ফাস্ট ফুড, ঠান্ডা পানীয়, বাসি খাবার এবং অতিরিক্ত চা বা কফি।
৫. আয়ুর্বেদিক ভেষজ ও জীবনযাপন
(সতর্কবার্তা: কোনো ভেষজ সেবনের আগে অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন)
আয়ুর্বেদে কিছু জাদুকরী ভেষজ এই সমস্যা সমাধানে ব্যবহৃত হয়:
-
অশোক ও লোধ্র: জরায়ুর টনিক হিসেবে কাজ করে।
-
শতাবরী: হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখে।
-
আমলকি ও যষ্টিমধু: প্রদাহ কমায় এবং রক্ত পরিশোধন করে।
লাইফস্টাইল টিপস: ১. প্রতিদিন ৭-৮ ঘণ্টা পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন। ২. সুতি ও ঢিলেঢালা পোশাক পরুন। ৩. যোগাসন (বজ্রাসন, ভদ্রাসন ও প্রাণায়াম) হরমোনাল ব্যালেন্স ফেরাতে দারুণ কার্যকর।
কখন অবশ্যই ডাক্তারের কাছে যাবেন?
-
যদি স্রাবে তীব্র দুর্গন্ধ বা চুলকানি থাকে।
-
টানা ২-৩ মাস মাসিক বন্ধ থাকলে।
-
সহ্যনাতীত পেট ব্যথা বা অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে।
শেষ কথা
একজন সুস্থ নারীই একটি সুস্থ সমাজ ও পরিবারের ভিত্তি। তাই শরীরের সংকেতকে অবহেলা করবেন না। ভয় বা লজ্জা ঝেড়ে ফেলে কথা বলুন, সচেতন হোন এবং সঠিক সময়ে চিকিৎসা নিন।
তথ্য – ডাঃ সোমনাথ দত্ত, B.A.M.S. (WBUHS)
Medical Officer, BSRGMACH
Consultant Ayurvedic Physician, লোকনাথ আয়ুর্বেদ, রায়গঞ্জ
